ট্রাম্পের শুল্কবিবাদ নিয়ে উদ্বেগ

মার্কিন বন্ড বাজার থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ঋণ বাজার যুক্তরাষ্ট্র।

ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ঋণ বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাকি বিশ্বের ওপর দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপিয়ে দেয়া শুল্কবিবাদ, বাণিজ্যযুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এ বাজারের আকর্ষণ কমিয়ে দিয়েছে। বড় বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন বন্ড বাজার থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এর বিপরীতে তারা বিশ্বের অন্যান্য বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনছেন। খবর এফটি।

কয়েকদিন আগে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়েছে কর ও ব্যয়সংক্রান্ত একটি বিল, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ বিলটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণের স্তর নিয়ে আগেই একাধিক বৈশ্বিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে গত মাসে ট্রাম্পের শুল্কনীতি সক্রিয় হওয়ার পর মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আগে অর্থনৈতিক সংকটময় সময়ে মার্কিন ঋণ বাজারকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কিন্তু এবার তা হয়নি।

ইউরোপের সর্ববৃহৎ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা আমুন্ডির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ভিনসেন্ট মরতিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগের জন্য এখন আর সর্বোচ্চ ও একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় নয়। দেশটি চরম আর্থিক শৃঙ্খলাহীনতার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।’

বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, নিকট ভবিষ্যতেও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলার বিশ্বে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।

তবে এমন অভিমতও আসছে যে, ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যযুদ্ধ ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, কেন আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনা এখন আরো বেশি জরুরি। বিশেষ করে অনেক বিদেশী ঋণ বাজার যখন হঠাৎ ভালো রিটার্ন দিচ্ছে।

জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের গ্লোবাল ফিক্সড ইনকাম বিভাগের প্রধান বব মিশেল বলেন, ‘আমাদের গ্রাহকরা এখন বিনিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন করছেন এবং বুঝতে পারছেন প্রচলিত ধারা অনুসরণ করে তারা যেভাবে ডলারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছেন, তা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। তারা এখন মার্কিন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক, বাজেট ঘাটতি ও ফেডারেল ঘাটতি।’

তিনি আরো জানান, গ্রাহকরা ভাবছেন, এ সুযোগে কেন অন্যান্য বাজারে বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনা হবে না?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর বিল পাস হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের দর ব্যাপকভাবে পড়ে যায়। কারণ দুর্বল ট্রেজারি নিলাম মার্কিন অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। গত বৃহস্পতিবার ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ৫ দশমিক ১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ।

এদিকে চলতি বছরে বৈশ্বিক প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার ৮ শতাংশ কমেছে। এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের মাল্টিসেক্টর ইনভেস্টিং বিভাগের প্রধান লিন্ডসে রোজনারের মতে, বাজারের এ অবস্থার পেছনে প্রধান অনুঘটক ডলার। এর সমপর্যায়ের তারল্যসম্পন্ন ও নীতিগতভাবে স্থিতিশীল বাজার খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে সাম্প্রতিক নানা সিদ্ধান্ত ডলারের মান কমেছে ও এতে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। এখন বিনিয়োগকারীরা দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও শক্তিশালী বৈচিত্র্য রয়েছে।

বন্ড ফান্ড জায়ান্ট পিমকোর ব্যবস্থাপনা দল চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের কারণে সৃষ্ট মন্দার ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ মানের অন্যান্য বাজারে বিনিয়োগ হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

এখন ভালো রিটার্নের সুযোগ থাকায় বিনিয়োগকারীরা বিশেষভাবে ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার ঋণ বাজারের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বব মিশেল বলেন, ‘আমি বলব যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের মার্কিন ডলারবহির্ভূত সম্পদের প্রতি আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে এখন ইউরোপে ভালো রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগে সবাই জার্মানি ও ফ্রান্সের দিকে তাকাত। কিন্তু এখন সেখানেও বাজেট বাড়ানোর চিন্তা চলছে, তাই আমরা এখন তাকাচ্ছি এমন দেশগুলোর দিকে যাদের ১৫ বছর আগে পেরিফেরাল বরোয়ার (ঋণ পরিশোধের দিকে থেকে কম নির্ভরযোগ্য) বলা হতো যেমন- ইতালি ও স্পেনের মতো দেশ।’

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সরকারি অর্থনীতি ঘিরে উদ্বেগ বাজারে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। কারণ কংগ্রেস ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৭ সালের করছাড় সম্প্রসারণের বিল এগিয়ে নিচ্ছে। স্বাধীন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আইন বার্ষিক ঘাটতি ও ঋণের বোঝা আরো বাড়াবে।

আমুন্ডির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ভিনসেন্ট মরতিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে সম্ভবত জিডিপির ৬-৭ শতাংশ ঘাটতি বহাল রাখবে। যেটি যেকোনো মানদণ্ডেই অনেক বেশি এবং এতে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন আরো বাড়বে। অর্থাৎ বাজারে আরো ট্রেজারি বন্ড আসবে।’

তিনি আরো জানান, বন্ডের চাহিদা থাকলেও অনেক ক্রেতা তখন আরো উচ্চ হারে ইল্ড চাইবে।

প্রাইভেট ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান কেকেআরের গ্লোবাল ম্যাক্রো অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যালোকেশন বিভাগের প্রধান হেনরি ম্যাকভের মতে, লিবারেশন ডে ছিল একটি মোড়, যা বিনিয়োগকারীদের মার্কিন বাজারের বাইরে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে একই সঙ্গে দুর্বল ডলার, শেয়ারবাজারের পতন এবং সুদহার বৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছে। এতে ঝুঁকির সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। ফলে সভরেন সম্পদ তহবিল থেকে শুরু করে ফ্যামিলি অফিস পর্যন্ত সব ক্ষেত্র ঝুঁকি কমাতে এবং মার্কিন সম্পদে অতিনির্ভরতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা।

আরও